advertisement
advertisement

কবরের প্রথম প্রহর: পরলৌকিক জগতের সূচনা ও অজানা সেই বাস্তবতা


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ৪:৩০ পূর্বাহ্ণ
কবরের প্রথম প্রহর: পরলৌকিক জগতের সূচনা ও অজানা সেই বাস্তবতা

advertisement

মৃত্যুর পর থেকে কেয়ামত পর্যন্ত প্রলম্বিত সময়কে বলা হয় ‘বরজখ’ বা অন্তর্বর্তীকালীন জগত, যার সর্বপ্রথম গন্তব্য হলো কবর। স্বজনেরা মৃতদেহকে আঁধার কবরে রেখে প্রস্থান করার পরই শুরু হয় পরকালীন জীবনের সবচেয়ে জটিল ও অপরিচিত ক্ষণ। হজরত ওসমান (রা.) কবরের কাছে দাঁড়ালে চোখ ভাসিয়ে কাঁদতেন; কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছিলেন যে কবর হলো আখেরাতের প্রথম ঘাঁটি, এখানে যে পরিত্রাণ পাবে তার পরবর্তী স্তরগুলো অনায়াস হয়ে যাবে।

দাফন শেষে মানুষের পদচিহ্নের আওয়াজ মিলিয়ে যেতে না যেতেই মৃত ব্যক্তি কবরের প্রাথমিক ও ভীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, যা হাদিসে ‘দাবগাতুল কবর’ বা কবরের সংকোচন নামে পরিচিত। মাটি চারপাশ থেকে বাসিন্দাকে তীব্র শক্তিতে চেপে ধরে। পাপী কিংবা পূণ্যবান—কারও জন্যই এই চাপ এড়ানোর উপায় নেই; তবে মুমিনের জন্য তা মায়ের স্নেহময় আলিঙ্গনের মতো অনুভূত হলেও পাপীদের জন্য তা পাঁজর গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো নিদারুণ হয়। মদিনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহাবি সাদ ইবনে মুয়াজের দাফন সম্পন্ন করে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, ‘কবরের একটি চাপ আছে; যদি কেউ এই চাপ থেকে রেহাই পেত, তবে সাদ ইবনে মুয়াজ রেহাই পেত।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২০৫৪)।

মাটির চাপের পর সেখানে আগমন ঘটে ‘মুনকার’ ও ‘নাকির’ নামের দুজন ভয়ংকর অবয়বের ফেরেশতার, যাঁদের চোখ তামার পাত্রের মতো প্রজ্বলিত এবং কণ্ঠস্বর মেঘের গর্জনের মতো। তাঁরা মৃতকে উঠিয়ে বসিয়ে কঠোরভাবে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন—‘তোমার রব কে?’, ‘তোমার ধর্ম কী?’ এবং ‘এই ব্যক্তি (মুহাম্মদ সা.) সম্পর্কে তুমি কী বলতে?’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৫৩)। পার্থিব কিংবা মুখস্থ কোনো জ্ঞান দিয়ে এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। দুনিয়ায় ইসলাম নির্দেশিত পথে চলা খাঁটি বিশ্বাসীদের অন্তরই কেবল সেদিন অটল রাখা হবে। পবিত্র কোরআনের সুরা ইব্রাহিমের ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ মুমিনদের ইহকাল ও পরকালে (কবরে) শাশ্বত বাণীর ওপর সুদৃঢ় রাখেন...।’ তাফসিরবিদ ইবনে কাসির লিখেছেন, কবরে মুনকার-নাকিরের জিজ্ঞাসাবাদের সময় মুমিনদের অবিচল রাখা এবং সঠিক জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাই এ আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/৫০৬, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)।

কবরের নির্জনতায় মৃত ব্যক্তির সুরক্ষাদাতা হয়ে দাঁড়ায় তার দুনিয়ার নেক আমলসমূহ। আজাব নিকটে আসতে চাইলে আমলগুলো মূর্ত রূপ নিয়ে তাকে ঢাল হয়ে রক্ষা করে। মৃত ব্যক্তির মাথার কাছে নামাজ, ডানপাশে রোজা, বাঁপাশে জাকাত এবং পায়ের অংশে দান-সদকা ও সদাচরণগুলো অবস্থান নেয়। ফেরেশতারা যেকোনো দিক দিয়ে পৌঁছাতে চাইলে আমলগুলো বাধা দিয়ে বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো পথ নেই (আল-কুরতুবি, আত-তাজকিরাহ বি-আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিরাহ, পৃষ্ঠা ১৫৪, মাকতাবাতুল বুখারি, কায়রো, ২০০৮)।

তিনটি প্রশ্নের নির্ভুল জবাব দিলে আসমান থেকে ঘোষণা আসে, ‘আমার বান্দা সত্য বলেছে।’ এরপর কবরে বেহেশতি বিছানা পেতে দিয়ে জান্নাতের একটি দরজা উন্মুক্ত করা হয়, যা দিয়ে স্নিগ্ধ বাতাস ও সুবাস আসতে থাকে; অন্যথায় বিছিয়ে দেওয়া হয় দোজখের আগুন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করেছেন, ‘কবর হলো বেহেশতের বাগানগুলোর মধ্য থেকে একটি বাগান অথবা দোজখের গর্তগুলোর মধ্য থেকে একটি গর্ত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৬০)। দাফন শেষেই দ্রুত ফিরে না এসে কবরের পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করা নবীজির সুন্নত। তিনি সাহাবিদের লক্ষ্য করে বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং সে যেন (জিজ্ঞাসাবাদের সময়) অবিচল থাকতে পারে, সেই দোয়া করো; কারণ এখনই তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২১)। দৃষ্টির আড়ালে থাকা এই অবধারিত বাস্তবতার জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি রাখাই বিচক্ষণ মুমিনের মূল লক্ষ্য।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর